স্টেথোস্কোপের জায়গা নিল গান, প্রেসক্রিপশনের পরিবর্তে শোনা গেল কবিতা, আর হাসপাতালের করিডোর যেন এক সন্ধ্যার জন্য শিল্প ও সংস্কৃতির বিস্তারে রূপ নিল ঐতিহাসিক ইন্ডিয়ান মিউজিয়ামে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে মণিপাল হসপিটালস কলকাতার চিকিৎসকেরা যখন সাংস্কৃতিক মঞ্চে উঠে এলেন, তখন এক অনন্য আবহে ধরা পড়ল কিভাবে কবিগুরুর চিরন্তন শব্দ, সংগীত ও দর্শন প্রজন্ম, পেশা ও সীমারেখা ছাড়িয়ে আজও মানুষের হৃদয় স্পর্শ করে। কলকাতার ঐতিহ্যবাহী ইন্ডিয়ান মিউজিয়ামে আয়োজিত এই বিশেষ অনুষ্ঠানে অংশ নেন মণিপাল হসপিটালস কলকাতার ইএম বাইপাস, মুকুন্দপুর, ঢাকুরিয়া, সল্টলেক ও ব্রডওয়ে ইউনিটের চিকিৎসকেরা। বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে এই সন্ধ্যা হয়ে ওঠে এক আবেগঘন সাংস্কৃতিক উদযাপন।
ভারতের প্রাচীনতম ও অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানের আবহে আয়োজিত এই অনুষ্ঠান স্বাস্থ্যসেবা, মানবিকতা ও সংস্কৃতির এক বিরল মেলবন্ধনের সাক্ষী হয়ে ওঠে। অসাধারণ ঐক্য ও শিল্পীসুলভ প্রকাশের মাধ্যমে বিভিন্ন ইউনিটের ১৯ জন চিকিৎসক একসঙ্গে পরিবেশন করেন রবীন্দ্রসংগীত ও আবৃত্তি। চিকিৎসার ব্যস্ত দায়িত্বের বাইরে এসে তাঁরা একত্রিত হন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের চিরন্তন সৃষ্টিকে সম্মান জানাতে। অনুষ্ঠানে পরিবেশিত হয় “জাগরণে যায় বিভাবরী”, “প্রাণ ভরিয়ে তৃষা হরিয়ে”, “আমি চিনি গো চিনি”, “মনে মোর মেঘের সঙ্গী” এবং “পাগলা হাওয়ার বাদল দিনে”-র মতো জনপ্রিয় রবীন্দ্রসংগীত। পাশাপাশি আবৃত্তি করা হয় “বাঁশি”, “নির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গ” এবং “শেষের কবিতা”-র অংশবিশেষ। এই পরিবেশনাগুলি রোগী, পরিজন, হাসপাতালের কর্মী ও আমন্ত্রিত অতিথিদের জন্য এক আবেগঘন ও নস্টালজিক পরিবেশ সৃষ্টি করে, যা আবারও মনে করিয়ে দেয়—সুস্থতা শুধুমাত্র চিকিৎসার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়।
এই প্রসঙ্গে ডঃ সায়ন ভট্টাচার্য, ডিরেক্টর, ইন্ডিয়ান মিউজিয়াম, কলকাতা (সংস্কৃতি মন্ত্রক, ভারত সরকার), বলেন, “রবীন্দ্রজয়ন্তী শুধুমাত্র একটি সাহিত্যিক বা সাংস্কৃতিক উদযাপন নয়, এটি ভারতের সামগ্রিক সাংস্কৃতিক চেতনার সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত একটি আবেগ। এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের প্রাচীনতম ও বৃহত্তম জাদুঘর হিসেবে ইন্ডিয়ান মিউজিয়ামও দেশের বৌদ্ধিক, শিল্প ও সামাজিক জাগরণের সঙ্গে পথ চলেছে, যার বড় অংশ জুড়ে রয়েছেন কবিগুরু স্বয়ং। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এমন এক বিশ্বদৃষ্টিভঙ্গির প্রতীক, যা জ্ঞান, মানবতা ও অন্তর্ভুক্তির উপর প্রতিষ্ঠিত। আজ যখন বিশ্বের বিভিন্ন জাদুঘর আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক ও মানুষের কাছাকাছি হয়ে উঠছে, তখন রবীন্দ্রনাথের দর্শন আরও প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে, কারণ তিনি কল্পনা করেছিলেন এমন এক সমাজের, যা শ্রেণি, ভাষা ও ভৌগোলিক বিভাজনের ঊর্ধ্বে। স্বাস্থ্যসেবা পেশার সঙ্গে যুক্ত মানুষদের এই উদযাপনে অংশগ্রহণ বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। পেশাগত ব্যস্ততার মধ্যেও তাঁরা এই ঐতিহাসিক প্রাঙ্গণে এসে তাঁদের সৃজনশীল সত্তাকে তুলে ধরেছেন। এটি ‘বিকাশ ভি, বিরাসত ভি’-র ভাবনাকে বাস্তব রূপ দেয়, যেখানে উন্নয়ন ও ঐতিহ্য একসঙ্গে এগিয়ে চলে।”
অনুষ্ঠানে রবীন্দ্রসংগীত পরিবেশনকারী মণিপাল হসপিটাল ব্রডওয়ে-এর সিনিয়র কনসালট্যান্ট – গ্যাস্ট্রোইনটেস্টাইনাল ও অ্যাডভান্সড ল্যাপারোস্কোপিক সার্জন ডঃ সন্দীপ চক্রবর্তী বলেন, “সংগীতের মধ্যে মানুষকে সান্ত্বনা দেওয়া, মানসিকভাবে সুস্থ করে তোলা এবং একসূত্রে বেঁধে রাখার এক অসাধারণ শক্তি রয়েছে। এই অনুষ্ঠানে রবীন্দ্রসংগীত পরিবেশন করা আমার কাছে অত্যন্ত বিশেষ অভিজ্ঞতা ছিল, কারণ এটি আমাদের চিকিৎসার ব্যস্ত দায়িত্ব থেকে কিছুটা সময়ের জন্য দূরে সরে এসে সংস্কৃতি ও আবেগের মাধ্যমে সকলের সঙ্গে সংযোগ স্থাপনের সুযোগ করে দিয়েছে। এই ধরনের উদ্যোগ আমাদের মনে করিয়ে দেয়, স্বাস্থ্যসেবা শুধুমাত্র চিকিৎসার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, মানুষের জীবনে উষ্ণতা, ইতিবাচকতা ও মানবিক সংযোগ পৌঁছে দেওয়াও তার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।”
মণিপাল হসপিটাল ইএম বাইপাস-এর সিনিয়র কনসালট্যান্ট ও এইচওডি – রোবোটিক, অ্যাডভান্সড ল্যাপারোস্কোপিক, ব্যারিয়াট্রিক ও গ্যাস্ট্রোইনটেস্টাইনাল সার্জারি বিভাগের ডঃ সুমন্ত দে বলেন, “রবীন্দ্রসংগীতের এক চিরন্তন প্রশান্তিদায়ক শক্তি রয়েছে, যা প্রজন্মের পর প্রজন্মকে একই আবেগে যুক্ত করে রাখে। এই অনুষ্ঠানের অংশ হতে পেরে সত্যিই খুব ভালো লেগেছে, কারণ এটি চিকিৎসক হিসেবে আমাদের আরেকটি পরিচয়কে তুলে ধরেছে—যেখানে শিল্প, সহমর্মিতা ও আবেগের গভীর সংযোগ রয়েছে। এমন সাংস্কৃতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ পরিবেশে রবীন্দ্রজয়ন্তী উদযাপন সন্ধ্যাটিকে আরও অর্থবহ ও স্মরণীয় করে তুলেছে।”
মণিপাল হসপিটাল মুকুন্দপুর-এর সিনিয়র কনসালট্যান্ট ও ইন-চার্জ – ইন্টারভেনশনাল রেডিওলজি বিভাগের ডঃ পার্থ প্রতিম সামুই বলেন, “রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গানে এমন এক আবেগের গভীরতা রয়েছে, যা মুহূর্তের মধ্যেই শান্তি ও একাত্মতার অনুভূতি তৈরি করে। এই অনুষ্ঠানে রবীন্দ্রসংগীত পরিবেশন করা ছিল অত্যন্ত সমৃদ্ধ এক অভিজ্ঞতা, কারণ এর মাধ্যমে আমরা হাসপাতালের গণ্ডির বাইরে গিয়েও শিল্প ও আবেগের মাধ্যমে মানুষের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করতে পেরেছি। এই ধরনের সাংস্কৃতিক সন্ধ্যা আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, আরোগ্য শুধুমাত্র চিকিৎসার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; সহমর্মিতা, সৃজনশীলতা ও ভাগ করে নেওয়া মানবিক অনুভূতির মধ্যেও তার গভীর প্রকাশ রয়েছে।”
এই ব্যতিক্রমী রবীন্দ্রজয়ন্তী উদযাপনের মাধ্যমে মণিপাল হসপিটালস কলকাতা আবারও প্রমাণ করল যে, স্বাস্থ্যসেবা শুধুমাত্র চিকিৎসার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; সংস্কৃতি, সহমর্মিতা ও সামাজিক সংযোগের মধ্য দিয়েও সুস্থতার এক সামগ্রিক পরিসর গড়ে তোলা সম্ভব। এই সন্ধ্যা তাই শুধু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের উত্তরাধিকারকেই উদযাপন করেনি, উদযাপন করেছে মানবিকতার সেই দিকটিকেও, যা প্রকৃত আরোগ্যের ভিত্তি।
মণিপাল হসপিটালস কলকাতার উদ্যোগে ইন্ডিয়ান মিউজিয়ামে শিল্প, সংগীত ও কবিতার মেলবন্ধনে রবীন্দ্রজয়ন্তী উদযাপন
Date:
Share:

