এই গ্রীষ্মে মুর্শিদাবাদের শতাব্দী প্রাচীন আম-ঐতিহ্য আবারও নতুনভাবে প্রাণ ফিরে পাচ্ছে। ‘মুর্শিদাবাদ হেরিটেজ ডেভেলপমেন্ট সোসাইটি’ এবং ‘হাউস অফ শেহেরওয়ালি’ যৌথভাবে আয়োজন করছে ‘মুর্শিদাবাদ আম উৎসব ২০২৬’—একটি মাসব্যাপী বিশেষ উৎসব, যা জেলার কিংবদন্তিতুল্য নবাবী আম, রন্ধন-ঐতিহ্য এবং আমবাগান-সংস্কৃতি কে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে।
ঐতিহাসিক শহর আজিমগঞ্জে অনুষ্ঠিত এই উৎসব পর্যটক, ভোজনরসিক এবং ঐতিহ্যপ্রেমীদের আমন্ত্রণ জানাচ্ছে ভারতের কিছু বিরল ও ঐতিহ্যবাহী আমের স্বাদ গ্রহণের জন্য। এই প্রজাতিগুলোর অনেকগুলোই কেবল মুর্শিদাবাদের শতবর্ষী আমবাগানগুলোতেই পাওয়া যায়।
একসময় বাংলার নবাবদের রাজধানী হিসেবে পরিচিত মুর্শিদাবাদ বর্তমানে ১৫০টিরও বেশি প্রজাতির আমের আবাসস্থল। প্রতিটি আমের সঙ্গে জড়িয়ে আছে রাজকীয়তা, বাণিজ্য এবং ঐতিহ্যের নিজস্ব ইতিহাস। বাজারে বিক্রি হওয়া সাধারণ আমের তুলনায়, এই বিশেষ প্রজাতিগুলোর প্রকৃত স্বাদ উপভোগ করা যায় গাছ থেকে সদ্য পাড়ার পরেই। স্থানীয়দের ভাষায়, “আমের আসল স্বাদ বাগানেই পাওয়া যায়।”
এই উৎসবে আগত অতিথিরা সবুজে ঘেরা আমবাগানের মনোরম পরিবেশে হেঁটে বেড়ানোর সুযোগ পাবেন, গাছ থেকে নিজ হাতে আম পাড়তে পারবেন এবং সদ্য পাড়া আমের অতুলনীয় সুবাস ও স্বাদের এক অনন্য অভিজ্ঞতা উপভোগ করতে পারবেন। উৎসবে প্রদর্শিত হবে মুর্শিদাবাদের বহু ঐতিহ্যবাহী ও দুর্লভ আমের সম্ভার। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য— কোহিতুর : নবাবদের সবচেয়ে প্রিয়, বিরল ও অসাধারণ সুস্বাদু আম, যা তার জাফরানের মতো মাদকতাময় সুবাসের জন্য বিখ্যাত। বিমলি : আকারে ছোট, অত্যন্ত মিষ্টি এবং পাতলা খোসাবিশিষ্ট এক বিশেষ জাতের আম। রানি : স্থানীয় আমের মধ্যে “রানি” নামে পরিচিত, সুগন্ধি ও রসে ভরপুর। ভবানী : ঘন, আঁশহীন শাঁসযুক্ত আম, যার স্বাদ দীর্ঘক্ষণ মুখে লেগে থাকে। কালা পাহাড় : এক বিখ্যাত সেনাপতির নামানুসারে নামকরণ করা এই আম গাঢ় রঙ ও তীব্র স্বাদের জন্য পরিচিত। সারন্ধ্র : মৌসুমের শুরুতেই পাকার উপযোগী, টক-মিষ্টি স্বাদের এবং অত্যন্ত সতেজতাদায়ক একটি জাত। এছাড়াও আরও বহু বৈচিত্র্যময় ও ঐতিহ্যবাহী আম এই উৎসবে স্থান পাবে।
“মুর্শিদাবাদের আম কেবল ফল নয়, এগুলি ইতিহাসের জীবন্ত অংশ,” বলেন ‘হাউস অফ শেহেরওয়ালি’-র প্রতিষ্ঠাতা এবং ‘মুর্শিদাবাদ হেরিটেজ ডেভেলপমেন্ট সোসাইটি’-র প্রেসিডেন্ট প্রদীপ চোপড়া। “এই আমগুলোর অনেক প্রজাতিই দীর্ঘ দূরত্বের বাণিজ্যিক পরিবহণে নিজেদের প্রকৃত স্বাদ হারিয়ে ফেলে। এই উৎসবের মাধ্যমে আমরা চাই মানুষ এই আমগুলোর আসল স্বাদ গ্রহণ করুক ঠিক সেই পরিবেশে, যেখানে এগুলো জন্মায়—মুর্শিদাবাদের ঐতিহাসিক আমবাগানে।”
দর্শনার্থীরা শেহেরওয়ালি সম্প্রদায়ের ঐতিহ্যবাহী রন্ধনপ্রণালী অনুযায়ী প্রস্তুত বিভিন্ন আম-ভিত্তিক পদও উপভোগ করতে পারবেন। এর মধ্যে থাকবে আম পান্না, কাঁচা আমের ক্ষীর, আমের চাটনি, আম সন্দেশ, আচার, শরবত এবং মৌসুমি ‘ফার্ম-টু-টেবিল’ খাবারের আয়োজন।
‘হাউস অফ শেহেরওয়ালি’ শুধুমাত্র একটি থাকার জায়গা নয়; এটি ভারতের প্রথম ‘মিউজিয়াম হোটেল’। পুনরুদ্ধার করা এই ঐতিহাসিক অট্টালিকাটি মুর্শিদাবাদের ঐতিহ্যবাহী শেহেরওয়ালি জৈন বণিক সম্প্রদায়ের সমৃদ্ধ উত্তরাধিকার বহন করে চলেছে। এর প্রতিটি আঙিনা, গ্যালারি ও কক্ষ যেন বাংলার নবাবি আমল, স্থানীয় কারুশিল্প, নদী-বাণিজ্য, স্থাপত্য এবং টেকসই জীবনযাত্রার ইতিহাসের কথা বলে।
অতিথিরা বিশেষভাবে পরিকল্পিত ২ দিন/২ রাত অথবা ৩ দিন/২ রাতের উৎসব প্যাকেজের মধ্যে থেকে পছন্দ করতে পারবেন। এই প্যাকেজগুলোর মধ্যে থাকবে আমবাগান ভ্রমণ, বিশেষ শেহের ওয়ালি ভোজ, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান এবং আজিমগঞ্জ রেল স্টেশন থেকে বিনামূল্যে যাতায়াতের সুবিধা।
মুর্শিদাবাদে পৌঁছানো এখন আরও সহজ ও সুবিধাজনক। ‘বন্দে ভারত এক্সপ্রেস’ হাওড়া এবং আজিমগঞ্জের মধ্যে দ্রুত যোগাযোগের সুযোগ করে দিচ্ছে। পাশাপাশি কলকাতা থেকে একাধিক রাত্রিকালীন এক্সপ্রেস ট্রেন পরিষেবা ও উপলব্ধ রয়েছে।
‘মুর্শিদাবাদ আম উৎসব ২০২৬’ অনুষ্ঠিত হবে ১ জুন থেকে ৩০ জুন ২০২৬ পর্যন্ত আজিমগঞ্জের ‘হাউস অফ শেহেরওয়ালি’-তে। এই উৎসব সারা দেশ থেকে আগত দর্শনার্থীদের আহ্বান জানাচ্ছে মুর্শিদাবাদের বিরল রাজকীয় আমের স্বাদ তাদের নিজস্ব প্রাকৃতিক পরিবেশে উপভোগ করার জন্য।
উৎসব উপলক্ষে সীমিত সংখ্যক আবাসন প্যাকেজ উপলব্ধ রয়েছে। তাই আগ্রহী অতিথিদের দ্রুত বুকিং সম্পন্ন করে এই অনন্য ঐতিহ্য ও ভোজন-অভিজ্ঞতার অংশ হয়ে ওঠার অনুরোধ জানানো হচ্ছে।
সংরক্ষণ ও বুকিং সংক্রান্ত তথ্যের জন্য অনুগ্রহ করে হাউস অফ শেহেরওয়ালি-এর সঙ্গে ৯৮৩১২১৪৫৬৮ অথবা ৯৩৮২১২৬৬৩১ নম্বরে যোগাযোগ করুন।

